গ্রীক “Autos", অর্থ “Self” থেকে Autism শব্দটির উদ্ভব। এখানে Self শব্দটি এইজন্য ব্যবহার করা হয়েছে যে Autism spectrum disorder -এ আক্রান্ত রোগীরা “আত্মকেন্দ্রিক” হয় এবং নিজেরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
পরিবেশের সাথে একজন সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষের যে ভাবের আদানপ্রদান, যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, এই সমস্ত রোগীতে তা পরিলক্ষিত হয় না বা খুবই কম পরিলক্ষিত হয়। বাইরের প্রকৃতি এবং পরিবেশের সাথে এদের কোন সংশ্লিষ্টতা থাকে না, সামাজিক বিষয়বসস্তুর সাথে এদের খুব কম সম্পর্ক থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে এদের চিন্তা-ভাবনা, কার্যকলাপ “বন্দি” হয়ে থাকে।
অতীতে এটিকে Autism বা Austic disorder বলা হতো, কিন্তু এই সমস্যার সাথে অনেকগুলো সমস্যা বর্নিলভাবে কখনো কম আবার কখনো বেশীভাবে আসে বলে একে Autism spectrum disorder বলে। কারণ - এর সাথে মানসিক বিকাশজনিত ত্রুটি, খীঁচুনী, ADHD এমনকি ২৫% শিশুর কথাবলার সমস্যা পর্যন্ত দেখা দিতে পারে।
তবে আশার কথা যে, অনেক - Autism spectrum disorder এর শিশুই বিশেষ কিছু বিষয়ে বিশেষভাবে পারদর্শী হয়ে ওঠে, যেমন মুখে মুখে বড় বড় অংক বা গননা তৎক্ষনাৎ করে ফেলা, বিশ্বের মানচিত্রের কোথায় কোন দেশ আছে তা মূহুর্তের মধ্যে বলে দেয়া, ভালো বাদ্যশীল্পি হয়ে ওঠা ইত্যাদি ইত্যাদি।
Autism spectrum disorder এর সাথে বিশেষ কিছু রোগের সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়, যেমন ফ্রাজেইল এক্স সিনড্রোম (Fragile X syndrome), রেট সিনড্রোম (Rett syndrome) ইত্যাদি, এবং অনেক চিকিৎসাবিজ্ঞানী ধারণা করেন, Autism spectrum disorder এর সাথে এই রোগগুলো সর্ম্পকযুক্ত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির সাথেসাথে ASD নিয়েও ব্যাপক গবেষনা হচ্ছে, যদিও এখনও অনেক জায়গায় (এমনকি ভারতবর্ষেও, যেখানে এ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষাধিক এবং বাংলাদেশে ৩ লক্ষাধিক, সেখানেও), ASD কে ভুল করে Mental retardation হিসাবে গন্য করা হয়।

আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্য, আইজ্যাক নিউটন, চার্লস ডারউইন, মাইকেল এ্যাঞ্জেলো, বিল গেটস, এ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মতো পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানীর এবং ব্যাক্তিত্বরাও Austic ছিলেন। হতে পারে এর কারণ, “আত্মকেন্দ্রিকতা এবং কোন একটি জিনিসের প্রতি লেগে থাকা অথবা উপরোক্ত কোন বিষয়ে বিশেষ পারদর্শীতা।
সুতরাং Autism spectrum disorder নিয়ে অতিরিক্ত দূঃশ্চিন্তার কিছু নেই, বরং মনে রাখতে হবে, একটু পরিচর্যা পেলে এই শিশুরাই হয়ে উঠতে পারে Special শিশু।
কারন (Causation)
⮊. জেনেটিক কারন (অন্যতম)

X ক্রোমোজোমে অবস্থিত Neuroligin (Neuroligin 4X-Linked) নামক একটি Gene এর মিউটেশন এর অন্যতম কারন। Neuroligin এর প্রোটিন, স্নায়ু সংযোগ বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন এবং অপরিহার্য্য। মূলতঃ Neurexins এবং Neuroligin স্নায়ুর Neurons এর মধ্যে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সংকেতের আদান প্রদান করে, একটা যোগাযোগ স্থাপন এবং একটি সম্পূর্ন Network তৈরী করে। নারীর X X ক্রোমোজোমের কোন একটিতে NLGN4X-Linked Gene এর মিউটেশন হলে আরেকটি X ক্রোমোজোম তা কাটিয়ে উঠতে পারে, কিন্তু পুরুষদের XY ক্রোমোজোমের X এ মিউটেশন হলে Y ক্রোমোজোম তা সারিয়ে নিতে পারে না।
⮊.বংশগত কারণ
- স্নায়ু ও মস্তিস্কের যথাযথ ও স্বাভাবিক বিকাশের ত্রুটিজনিত কারন।
- বিশেষ কিছু রোগজনিত কারণ, যেমন, টিউবেরাস স্কে¬রোসিস কমপ্লেক্স (Tuberous sclerosis complex) ইত্যাদি।
⮊. গর্ভকালীন মায়ের বিশেষ কিছু রোগ ও ত্রুটিজনিত কারণ, যেমন
- গর্ভাবস্থায় মায়ের রুবেলা ভাইরাস বা সাইটোমেগালো ভাইরাসের সংক্রামণ।
- সময়ের অত্যাধিক পূর্বে বা পরে সন্তান ভূমিষ্ট হওয়া।
- দীর্ঘমেয়াদী এবং কষ্টকর প্রসব।
- সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সময় সন্তানের মস্তিস্কে আঘাত।
- গর্ভকালীন সময়ে, কোন রাসায়নিক দ্রব্য দ্বারা উচ্চমাত্রায় ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া। গর্ভকালীন এমন কোন পরিবেশে কাজ করা যেখানে অত্যাধিক বিকিরণ, অত্যাধিক বায়ুদূষন বা রাসায়নিক বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- গর্ভাবস্থায় পারিবারিক অশান্তি।
- গর্ভকালীন মায়ের অপুষ্টি।
- মায়ের মৃগী, সিজোফ্রেনিয়া, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার ইত্যাদি রোগ থাকা।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া, গর্ভাবস্থায় উচ্চমাত্রার ঔষধ সেবন।
⮊. শিশুর নিজস্ব বিশেষ কিছু রোগ ও রোগ সংক্রামন জনিত কারণ, যেমন
- এনকেফালাইটিস, হার্পিস সিমপ্লেক্স জীবানুর সংক্রামন।
- জন্মগতভাবে শিশুর মস্তিস্কের গঠনগত ত্রুটি।
- ভূমিষ্ট হবার পর মস্তিস্কের যে কোন ধরণের গঠনগত বা কার্যগত ত্রুটি।
- অপরিণত শিশু।
- কম ওজনের শিশু।
⮊. পরিবেশগত কারন, যেমন
- দেরীতে বিবাহ।
- খাদ্যে বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান, কৃত্রিম রং, কীটনাশক, যা জিনের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর এবং নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।
কারা অধিক আক্রান্ত হন (More prone to)
●. যে কেউ ASD নিয়ে জন্মগ্রহন করতে পারে। সাধারণত: ভূমিষ্ট হওয়ার ৩০ মাসের মধ্যেই আটিজম আক্রান্ত শিশুকে সনাক্ত করা যায়।
●. পিতা-মাতার মধ্যে যে কারো একজনের ASD থাকলে তাঁদের শিশুর ASD হবার সম্ভাবনা থাকে।
●. ছেলে শিশুরা অধিক আক্রান্ত হন।
●. প্রথম ছেলে সন্তানরা অধিক আক্রান্ত হন।
●. Monozygotic জমজ শিশুদের হবার সম্ভাবনা অধিক থাকে।
●. শতকরা ২ জন শিশুর ASD হবার সম্ভাবনা থাকে এবং প্রবনতা লক্ষ্য করা যায় (উদ্বেগজনক হারে এটি বাড়ছে এবং একটি বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হতে যাচ্ছে)।
ক্লিনিক্যাল ফিচার (Clinical features)
লক্ষন (Symptoms)

মনে রাখতে হবে
Autism spectrum disorder এর লক্ষনগুলো ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে
⮚. গুরুত্বপূর্ন লক্ষন,
♦. এরা নিজেকে নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে রাখে।
♦. বাস্তব জগৎ এবং বাস্তবতার সাথে এদের কোন সম্পর্ক থাকে না।
♦. খুব ছোটছোট বিষয়ে অত্যাধিক মনোযোগী হয়ে ওঠে। অনেকসময় এতক্ষুদ্র বিষয়ে মনোযোগী হয়ে ওঠে যে, আশেপাশে কোন বড়ধরণের শব্দ বা ঘটনা হলেও সেদিকে তার মনোযোগ আকৃষ্ট হয় না।
♦. চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবে না, বিশেষত: অপরিচিতজনদের সাথে।
♦. স্বাভাবিক অন্য শিশুর মতো এদের মধ্যেও আবেগ, প্রেম, ভালবাসা থাকে তবে তা প্রকাশ করার ক্ষমতা এদের থাকে না। কখনো কখনো এইসব শিশুরা আবেগপ্রবন হয় না বরং সম্পূর্ন আবেগ বিবর্জিতধরণের হয়। আবার অনেকসময় এইসব শিশুদের মধ্যে আবেগ অনুভূতি, এদের মুখাবয়বে প্রকাশ পায় না।
♦. বন্ধুত্ব তৈরী করতে পারে না (প্রকৃতপক্ষে কিভাবে এবং কোন বিষয়বন্তু দিয়ে কথা শুরু করতে হবে এটা শিশু বুঝতেই পারে না)। তার সমবয়সীদের সাথে দলগতভাবে খেলতে পছন্দ করে না, বরং একাই খেলতে বং খেলনাটি তার দখলে নিতে চায়।
♦. অন্য স্বাভাবিক শিশুর ভেতর যে Body language দেখা যায়, যেমন হাত বাড়িয়ে কোলে উঠতে চাওয়া, বা পানির গ্লাসের দিকে হাত বাড়িয়ে ইশারা করা, Autism spectrum disorder -এর শিশুদের ক্ষেত্রে এসব দেখতে পাওয়া যাবে না। অনেকসময় মা যদি শিশুকে কোলে নেয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দেন, সেক্ষেত্রেও শিশুর মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাবে না, শিশু নির্ল্পিপ্ত হয়ে থাকবে।
♦. কোনকোন শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি থালা বা গ্লাসেই সে সবসময় খেতে চায় অথবা একটি পোশাকই বারবার পড়তে চায় বা একই খেলা বা গান বারবার শুনতে চায় এবং শুনতেই থাকে, ব্যতিক্রম হলে সে সেটাকে মেনে নিতে পারে না।
♦. কখনো কখনো অকারণেই ভীষন অস্থিরতা প্রকাশ করতে থাকে, দূর্বোধ্যভাবে চিৎকার করতে থাকে।
♦. শিশু তার ব্যক্তিগত কাজগুলো, যেমন ব্রাশ করা, শার্টের বোতাম লাগানো, জুতোর ফিতা বাঁধা এসব করতে পারে না।
♦. I.Q level অত্যন্ত কম হয়।
⮚. অন্যান্য লক্ষন,
♦. কথাবলা দেরীতে শেখে, বা কথা বলে না।
♦. অনেকসময় শিশু অকারণেই হাততালি দিতে থাকে বা একটা খেলনা নাড়াতেই থাকে (Twiddling) অথবা ছন্দবদ্ধভাবে একটানা বিরক্তিকর শব্দ করতেই থাকে (Echolalia)। অনেকসময় কাল্পনিক কিছু নিয়ে অযথাই খেলতে থাকে।
♦. খেলাধুলোর সময়, খেলনা নিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করা, যেমন একটি খেলনা গাড়ির উপর আরেকটি খেলনা গাড়ি অস্বাভাবিকভাবে তুলে দেয়া, কোন ব্লক তৈরীর সময় সেটি শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে করতে না পারা।
♦. Pronoun reversal হতে পারে, অর্থাৎ “আমার একটা খেলনা লাগবে” না বলে শিশু বলতে পারে, “তোমার একটা খেলনা লাগবে।”
♦. অনেকসময় অতীতের কিছু ঘটনার সাথে মিলিত করে শিশু মনগড়া কিছু গল্পের সৃষ্টি করতে পারে।
♦. প্রায়ই কোনকিছু শেখানোর পর তা শিশু বারবার ভুলে যায়।
♦. কোন প্রশ্ন করলে উত্তর দেয় না অথবা অনেকক্ষন পর এত দীর্ঘ উত্তর দেয় যে যার কোন প্রয়োজনই নেই। অনেকসময় আবার দেখা যায়, প্রশ্নকর্তার প্রশ্নকেই ঘুরিয়ে প্রশ্ন করতে থাকে এবং বারবার সেটার পূনরাবৃত্তি করতেই থাকে।
♦. অধিকাংশ শিশুদের মধ্যেই উজ্জ্বল আলো, উজ্জ্বল রং নিয়ে বারবার খেলতে দেখার প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়।
প্যাথলজীক্যাল ইনভেষ্টিগেশান (Pathological investigations)
প্রয়োজন নেই।
ব্যবস্থাপনা (Management)
- অবশ্যই লক্ষনসাদৃশ্যে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে।
- অভিভাবককে ধৈর্য্য সহকারে হোমিওপ্যাথি ঔষধ সেবনের পরামর্শ দিতে হবে। অটিজম সমাধানের কোন রাতারাতি চিকিৎসা পদ্ধতি নেই, এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যা পরিকল্পনা।
- হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার পাশাপাশি Behavioral therapy. Communication therapy. Educational therapy দিলে রোগী দ্রুত সুস্থতা লাভ করে।
অটিস্টিক শিশুর বাবা-মায়ের জন্য করনীয়
- সন্তানের এ ধরনের উপসর্গকে লুকিয়ে রাখবেন না বা আড়াল করবেন না।
- শিশুকে পরিবার থেকেই সামাজিকতা শিখতে হবে। একারনে শিশুটিকে সামাজিকভাবে বেড়ে ওঠারও সুযোগ দিতে হবে। শিশুটিকে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান এবং আচার অনুষ্ঠানে সাথে নিয়ে যান।
- শিশুকে খেলতে উৎসাহিত করুন, বিশেষ করে দলগতভাবে হাসি আনন্দের যে খেলাগুলো আছে, যেমন কানামাছি, গোল্লাছুট, ছোঁয়াছুয়ি ইত্যাদিতে শিশুকে অংশ গ্রহন করান।
- Autism spectrum disorder শিশুদের অন্যতম সমস্যার মধ্যে একটি হলো কথা বলতে না পারা, কথা শেখানোর জন্য শিশুকে একটি করে জিনিস নিয়ে সেগুলোর নাম স্পষ্ট করে বলতে শেখান। শিশুর সাথে সময় পেলেই কথা বলুন। তার সমবয়সীদের সাথে বেশী বেশী খেলার সুযোগ দিন।
- শিশুকে প্রতীকি ভাষা বা আকার ইঙ্গিতে বা অঙ্গভঙ্গি করে, ছবি দেখিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে শেখান।
- শিশুর ব্যক্তিগত কাজ যেমন, ব্রাশ করা, পোশাক পড়া, নিজের যত্ন নেয়া ইত্যাদি কাজে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করতে সাহায্য করুন।
- শিশু কাঙ্খিত আচরন করলে তাকে পুরস্কৃত করুন আর অনাকাঙ্খিত কাজ করলে তাকে তিরস্কার না করে তার কারন জানার চেষ্টা করুন এবং স্বাভাবিক আচরন করুন।

যে কোন সমস্যায় আপনার নিকটস্থ দক্ষ এবং অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নিরাপদ ও সাশ্রয়ী।
আপনার সুস্বাস্থ্য ও সার্বিক মঙ্গল কামনায়,
বি.এইচ.এম.এস.
নওয়াব আলী হোমিও চিকিৎসালয়, বালুবাগান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
প্রাক্তন প্রভাষক, রহনপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

